১১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬

স্মৃতির পাতা থেকে বেগম জিয়া

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট: ০৯:১৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 76

—তানজিনা নওশিন, ওয়াশিংটন প্রবাসি সমাজকর্মী

লেখার শুরুতেই পরিষ্কার করতে চাই, আমি নিজেকে মোটামুটি দল নিরপেক্ষ একজন মানুষ মনে করি। আমার পরিবারের অনেকেই রাজনৈতিক ভাবে কোন কোন দলের সাথে সক্রিয় ভাবে এফিলিয়েটেড।কিন্তু সেটা কোনো ভাবেই আমার নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের বহিঃপ্রকাশ নয়।

যাই হোক, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম। ১৯৮৯ বা ৯০ র দিকের একটা ঘটনা, আজ কদিন ধরে বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।আমি তখন অনেক ছোটো। বয়স ৭ কি ৮। আমরা তখন যে বাড়িতে থাকতাম, তার ঠিক পাশেই সাদেক হোসেন খোকা চাচার বাড়ি।রামকৃষ্ণ মিশন রোড, গোপীবাগ।

আমাদের দুই বাড়ির মাঝে এক বিশাল মাঠ ছিলো, বিশাল মানে বিশাল, আমাদের বাড়িটা ছিলো একতলা একটা বিল্ডিং সামনে ছোট্ট একটা বাগান, একটা ঘাটলা দেওয়া পুকুর আর হরিনের খাঁচা। লাল সিরামিক ইটের তৈরী বলে এলাকায় আমাদের এই বাড়িটা “লাল বাড়ি” নামে পরিচিত ছিলো।

সেসময় ঢাকা শহর এতো ঘিন্জি ছিলো না। যাই হোক কোনো এক রোজার দিনে ঐ মাঠে খোকা চাচা ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে, প্রধান অতিথি বেগম খালেদা জিয়া। খোকা চাচার বাসা ঐ মাঠ থেকে একটু দূরে হওয়ার জন্য, আমাদের লিভিং রুমে মহিলাদের নামাজের ব‍্যবস্থা করা হলো।

সেসময়ে রাজনৈতিক প্রোগ্রাম গুলো এতোটা রাজকীয় ভাবে আয়োজন করা হতো না, খুবই অর্গানিক আর সাধাসিধা আয়োজন। যাইহোক, ইফতার শেষে বেগম জিয়া দুই তিনজন মহিলা সহ আমাদের বাড়িতে নামাজ পড়লেন, আম্মা উনাদের জন‍্য চায়ের ব‍্যাবস্থা করলেন।
কেমন আছেন, আমি ভালো আছি – এমন দুচারটে কথোপকথন শেষে ওনারা বিদায় নিলেন।

মজার ব‍্যাপার হলো, ইফতারের আগে মাঠে যখন জনসভা শুরু হবে, বেগম জিয়া গাড়ি থেকে নেমে যখন পথ ধরে হেঁটে আসছিলেন; ছোট্ট আমি খেয়াল করলাম উনার জন‍্য আয়োজক রা কোনো ফুল বা ব‍্যুকের ব‍্যাবস্থা করেননি। আমার মাথায় ঠিক কি কাজ করলো জানিনা, আমি দৌড়ে আমাদের বাগান থেকে ২/৩ টা লাল গোলাপ ছিঁড়ে আনলাম। উনি স্টেজে ওঠার আগ মুহূর্তে আমি উনাকে ফুলগুলো দিলাম। উনি একাহাতে ফুলগুলো নিয়ে আর এক হাত দিয়ে আলতো করে আমার গালে আদর করে দিলেন। খুব মায়াবি একটা স্পর্শ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে উনি মাড় দেওয়া একটা সাদা সূতী শাড়ি পড়েছিলেন, ছাই রঙা পাড়ের।মাঝে সিঁথি করে পিছনে হাতখোঁপা করা চুল। আমার ছোট্ট মনে এমন সুন্দর একটা মুখ আজীবনের জন‍্য আটকে গিয়েছিল। এর পরে আরও বেশকয়েকবার তার কাছাকাছি হবার সুযোগ আমার এসেছিল বটে, তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমার শিশুমনে তার যেই ইমেজটা তৈরি হয়েছিল, তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

আমরা এমন একটা দেশের নাগরিক, যে দেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা-কর্মী কোননা কোনোভাবে কনট্রভার্সিয়াল। বিভিন্ন ধরনের অন‍্যায়-অপরাধ, দূর্নীতি, অতি কথন ও অপকর্মের সাথে তারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে যুক্ত ছিলেন বা আছেন।

কমপারেটিভ স্টাডি করলে বেগম জিয়া বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাদের মধ‍্যে ব‍্যাতিক্রম। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন ছাড়া তাঁর রাজনৈতিক ক‍্যারিয়ারে আমি অন্তত দৃশ‍্যমান বড় কোনো পলিটিক্যাল কনট্রভার্সি দেখি না। হ‍্যা এটা সত‍্য তাঁর দলের অনেক নেতা-কর্মী বা সমর্থক কিংবা তার অনেক আত্মীয়স্বজন অনেক ধরনের অন‍্যায়-অপরাধ সংঘটন করেছিলেন অতীতে ও বর্তমানেও; দলের একজন টপমোস্ট লিডার হিসেবে সেসবের দায়িত্ব কম-বেশি তাঁর উপরও বর্তায়।

কিন্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অপরাধের তুলনায় তা অত‍্যন্ত নগন‍্য নিঃসন্দেহে। সর্বোপরি একজন মানুষের যে বিষয়টা অন‍্যের মধ্যে ইমেজ সৃষ্টি করতে প্রধানতম ভাবে ভূমিকা রাখে, তা হলো তার ব‍্যাক্তিত্ব তার কথা বলার ধরন, তার শব্দ চয়ন।

বেগম জিয়ার স্ট্রং পারসোনালিটি, তাঁর পরিমিতিবোধ – মানুষ নিশ্চিতভাবে মনে রাখবে বহুদিন। তাঁর আরেকটা বিষয় আমাকে খুবই মুগ্ধ করে যে, দেশের এবং ওনার চরম দূর্যোগময় পরিস্থিতিতেও ওনি কখনও দেশ ছেড়ে যাননি, বিভিন্নভাবে তাঁকে প্রস্তাব দেবার পরও।

অন দ‍্যা আদার হ্যান্ড, শেখ হাসিনা কে আমরা বারবারই দেখেছি সমস্যা আসলেই কোনপ্রকার দেরী না করে নিজেকে সেইফ রাখার জন্য দ্বিতীয়বার না ভেবে দেশ ছাড়তে। এই যে ডিফারেন্স বিটউইন পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড – ইট এ‍্যডেড এ‍্য হিউজ ভ‍্যালু টু হার এ‍্যজ এ‍্য লিডার অব এ‍্য কান্ট্রি।

ওনার যে বয়স এবং শারীরিক অবস্থা – তাতে হয়তো বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিকট ভবিষ্যতে তাঁর পক্ষে রিমার্কেবল কোনো ধরণের ভূমিকা রাখা মোটামুটি প্রায় অসম্ভব; কিন্ত ওনার এবং ওনার পরিবারের উপর দিয়ে বিগত সরকার ও ১/১১ এর সরকারের আমলে যে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ওনার দল সরকার গঠন করেছে এবং ওনার পরিবারের সদস্যরা দেশে ফিরে নিরাপদে ওনার কাছাকাছি থাকছে; মৃত্যুর পূর্বে উনি সেটা দেখে যাওয়াটা অবশ্যই ডিজার্ভ করেন।

আল্লাহ ওনাকে সুস্থ করে দিন, এবং ওনার নেক হায়াত দিন – সেই দোয়াই করি মনে ও মননে।

 

লেখক: —তানজিনা নওশিন,ওয়াশিংটন প্রবাসি সমাজকর্মী

 

শেয়ার করুন
ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

স্মৃতির পাতা থেকে বেগম জিয়া

আপডেট: ০৯:১৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫

—তানজিনা নওশিন, ওয়াশিংটন প্রবাসি সমাজকর্মী

লেখার শুরুতেই পরিষ্কার করতে চাই, আমি নিজেকে মোটামুটি দল নিরপেক্ষ একজন মানুষ মনে করি। আমার পরিবারের অনেকেই রাজনৈতিক ভাবে কোন কোন দলের সাথে সক্রিয় ভাবে এফিলিয়েটেড।কিন্তু সেটা কোনো ভাবেই আমার নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের বহিঃপ্রকাশ নয়।

যাই হোক, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম। ১৯৮৯ বা ৯০ র দিকের একটা ঘটনা, আজ কদিন ধরে বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।আমি তখন অনেক ছোটো। বয়স ৭ কি ৮। আমরা তখন যে বাড়িতে থাকতাম, তার ঠিক পাশেই সাদেক হোসেন খোকা চাচার বাড়ি।রামকৃষ্ণ মিশন রোড, গোপীবাগ।

আমাদের দুই বাড়ির মাঝে এক বিশাল মাঠ ছিলো, বিশাল মানে বিশাল, আমাদের বাড়িটা ছিলো একতলা একটা বিল্ডিং সামনে ছোট্ট একটা বাগান, একটা ঘাটলা দেওয়া পুকুর আর হরিনের খাঁচা। লাল সিরামিক ইটের তৈরী বলে এলাকায় আমাদের এই বাড়িটা “লাল বাড়ি” নামে পরিচিত ছিলো।

সেসময় ঢাকা শহর এতো ঘিন্জি ছিলো না। যাই হোক কোনো এক রোজার দিনে ঐ মাঠে খোকা চাচা ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে, প্রধান অতিথি বেগম খালেদা জিয়া। খোকা চাচার বাসা ঐ মাঠ থেকে একটু দূরে হওয়ার জন্য, আমাদের লিভিং রুমে মহিলাদের নামাজের ব‍্যবস্থা করা হলো।

সেসময়ে রাজনৈতিক প্রোগ্রাম গুলো এতোটা রাজকীয় ভাবে আয়োজন করা হতো না, খুবই অর্গানিক আর সাধাসিধা আয়োজন। যাইহোক, ইফতার শেষে বেগম জিয়া দুই তিনজন মহিলা সহ আমাদের বাড়িতে নামাজ পড়লেন, আম্মা উনাদের জন‍্য চায়ের ব‍্যাবস্থা করলেন।
কেমন আছেন, আমি ভালো আছি – এমন দুচারটে কথোপকথন শেষে ওনারা বিদায় নিলেন।

মজার ব‍্যাপার হলো, ইফতারের আগে মাঠে যখন জনসভা শুরু হবে, বেগম জিয়া গাড়ি থেকে নেমে যখন পথ ধরে হেঁটে আসছিলেন; ছোট্ট আমি খেয়াল করলাম উনার জন‍্য আয়োজক রা কোনো ফুল বা ব‍্যুকের ব‍্যাবস্থা করেননি। আমার মাথায় ঠিক কি কাজ করলো জানিনা, আমি দৌড়ে আমাদের বাগান থেকে ২/৩ টা লাল গোলাপ ছিঁড়ে আনলাম। উনি স্টেজে ওঠার আগ মুহূর্তে আমি উনাকে ফুলগুলো দিলাম। উনি একাহাতে ফুলগুলো নিয়ে আর এক হাত দিয়ে আলতো করে আমার গালে আদর করে দিলেন। খুব মায়াবি একটা স্পর্শ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে উনি মাড় দেওয়া একটা সাদা সূতী শাড়ি পড়েছিলেন, ছাই রঙা পাড়ের।মাঝে সিঁথি করে পিছনে হাতখোঁপা করা চুল। আমার ছোট্ট মনে এমন সুন্দর একটা মুখ আজীবনের জন‍্য আটকে গিয়েছিল। এর পরে আরও বেশকয়েকবার তার কাছাকাছি হবার সুযোগ আমার এসেছিল বটে, তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমার শিশুমনে তার যেই ইমেজটা তৈরি হয়েছিল, তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

আমরা এমন একটা দেশের নাগরিক, যে দেশে প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা-কর্মী কোননা কোনোভাবে কনট্রভার্সিয়াল। বিভিন্ন ধরনের অন‍্যায়-অপরাধ, দূর্নীতি, অতি কথন ও অপকর্মের সাথে তারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে যুক্ত ছিলেন বা আছেন।

কমপারেটিভ স্টাডি করলে বেগম জিয়া বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাদের মধ‍্যে ব‍্যাতিক্রম। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচন ছাড়া তাঁর রাজনৈতিক ক‍্যারিয়ারে আমি অন্তত দৃশ‍্যমান বড় কোনো পলিটিক্যাল কনট্রভার্সি দেখি না। হ‍্যা এটা সত‍্য তাঁর দলের অনেক নেতা-কর্মী বা সমর্থক কিংবা তার অনেক আত্মীয়স্বজন অনেক ধরনের অন‍্যায়-অপরাধ সংঘটন করেছিলেন অতীতে ও বর্তমানেও; দলের একজন টপমোস্ট লিডার হিসেবে সেসবের দায়িত্ব কম-বেশি তাঁর উপরও বর্তায়।

কিন্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অপরাধের তুলনায় তা অত‍্যন্ত নগন‍্য নিঃসন্দেহে। সর্বোপরি একজন মানুষের যে বিষয়টা অন‍্যের মধ্যে ইমেজ সৃষ্টি করতে প্রধানতম ভাবে ভূমিকা রাখে, তা হলো তার ব‍্যাক্তিত্ব তার কথা বলার ধরন, তার শব্দ চয়ন।

বেগম জিয়ার স্ট্রং পারসোনালিটি, তাঁর পরিমিতিবোধ – মানুষ নিশ্চিতভাবে মনে রাখবে বহুদিন। তাঁর আরেকটা বিষয় আমাকে খুবই মুগ্ধ করে যে, দেশের এবং ওনার চরম দূর্যোগময় পরিস্থিতিতেও ওনি কখনও দেশ ছেড়ে যাননি, বিভিন্নভাবে তাঁকে প্রস্তাব দেবার পরও।

অন দ‍্যা আদার হ্যান্ড, শেখ হাসিনা কে আমরা বারবারই দেখেছি সমস্যা আসলেই কোনপ্রকার দেরী না করে নিজেকে সেইফ রাখার জন্য দ্বিতীয়বার না ভেবে দেশ ছাড়তে। এই যে ডিফারেন্স বিটউইন পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড – ইট এ‍্যডেড এ‍্য হিউজ ভ‍্যালু টু হার এ‍্যজ এ‍্য লিডার অব এ‍্য কান্ট্রি।

ওনার যে বয়স এবং শারীরিক অবস্থা – তাতে হয়তো বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিকট ভবিষ্যতে তাঁর পক্ষে রিমার্কেবল কোনো ধরণের ভূমিকা রাখা মোটামুটি প্রায় অসম্ভব; কিন্ত ওনার এবং ওনার পরিবারের উপর দিয়ে বিগত সরকার ও ১/১১ এর সরকারের আমলে যে অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ওনার দল সরকার গঠন করেছে এবং ওনার পরিবারের সদস্যরা দেশে ফিরে নিরাপদে ওনার কাছাকাছি থাকছে; মৃত্যুর পূর্বে উনি সেটা দেখে যাওয়াটা অবশ্যই ডিজার্ভ করেন।

আল্লাহ ওনাকে সুস্থ করে দিন, এবং ওনার নেক হায়াত দিন – সেই দোয়াই করি মনে ও মননে।

 

লেখক: —তানজিনা নওশিন,ওয়াশিংটন প্রবাসি সমাজকর্মী

 

শেয়ার করুন