০১:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

হরমোনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন দেশের অর্ধেক মানুষ

ইউএনএ নিউজ
  • আপডেট: ১১:৪২:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / 3

রাজধানীর পরীবাগে অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি) এর আয়োজনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছবি : ইউএনএ

দেশে হরমোনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা নীরবে মহামারির আকার ধারণ করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনো হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। তবে রোগ জটিল পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রায় ৪০০ ধরনের রোগ হতে পারে।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর পরীবাগে অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। আগামীকাল শুক্রবার বিশ্ব হরমোন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সহযোগিতা করেছে রেনাটা পিএলসি।

সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, মূলত জীবনযাত্রার অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবই এই সংকটের প্রধান কারণ। এ ছাড়া পরিবেশগত প্রভাব যেমন প্লাস্টিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শ এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিকিরণ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

এসেডবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফরিদ উদ্দিন বলেন, শরীরে প্রায় ৫০ রকমের হরমোন থাকে। এগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা উচ্চ রক্তচাপের মতো ভয়াবহ রোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো অস্ত্রোপচার বা অন্য রোগের পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ এসব রোগ ধরা পড়ে। ফলে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ জানতেই পারে না যে তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন জানান, অধিকাংশ হরমোনজনিত রোগই প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অপচিকিৎসা পরিহার করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ বলেন, হরমোন নিয়ে ভুল ধারণা দূর করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হবে। অপচিকিৎসা বা অবৈজ্ঞানিক প্রচারণা থেকে দূরে থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণই হতে পারে সুস্থ জীবনের প্রধান চাবিকাঠি। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা শুধু একটি রোগ নয়, বরং শত শত রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই সময়-সচেতন, জীবনযাত্রা বদলানো এবং সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হরমোনজনিত সমস্যা এখন আর কেবল বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা, খেলাধুলার অভাব এবং ফাস্টফুড আসক্তির কারণে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে স্থূলতা ও ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে। এটি ভবিষ্যতে তাদের হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. শারমিন জাহান নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রসঙ্গে বলেন, নারীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), অনিয়মিত মাসিক ও বন্ধ্যত্বের মতো সমস্যাগুলো এখন প্রকট। সামাজিক সংকোচ ভেঙে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এসেডবির সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. রুহুল আমীন, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল ইসলাম, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আতিকুর রহমান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এমএ হালিম খান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুরজাহান বানু ও রেনাটা পিএলসির হেড অব মার্কেটিং (ডার্মা পোর্টফোলিও) খায়রুল ইসলাম প্রমুখ।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

হরমোনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন দেশের অর্ধেক মানুষ

আপডেট: ১১:৪২:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর পরীবাগে অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি) এর আয়োজনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছবি : ইউএনএ

দেশে হরমোনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা নীরবে মহামারির আকার ধারণ করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনো হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। তবে রোগ জটিল পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রায় ৪০০ ধরনের রোগ হতে পারে।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর পরীবাগে অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। আগামীকাল শুক্রবার বিশ্ব হরমোন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সহযোগিতা করেছে রেনাটা পিএলসি।

সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, মূলত জীবনযাত্রার অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবই এই সংকটের প্রধান কারণ। এ ছাড়া পরিবেশগত প্রভাব যেমন প্লাস্টিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শ এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিকিরণ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

এসেডবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফরিদ উদ্দিন বলেন, শরীরে প্রায় ৫০ রকমের হরমোন থাকে। এগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা উচ্চ রক্তচাপের মতো ভয়াবহ রোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো অস্ত্রোপচার বা অন্য রোগের পরীক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ এসব রোগ ধরা পড়ে। ফলে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ জানতেই পারে না যে তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন জানান, অধিকাংশ হরমোনজনিত রোগই প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অপচিকিৎসা পরিহার করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ বলেন, হরমোন নিয়ে ভুল ধারণা দূর করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হবে। অপচিকিৎসা বা অবৈজ্ঞানিক প্রচারণা থেকে দূরে থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণই হতে পারে সুস্থ জীবনের প্রধান চাবিকাঠি। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা শুধু একটি রোগ নয়, বরং শত শত রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই সময়-সচেতন, জীবনযাত্রা বদলানো এবং সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হরমোনজনিত সমস্যা এখন আর কেবল বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা, খেলাধুলার অভাব এবং ফাস্টফুড আসক্তির কারণে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে স্থূলতা ও ডায়াবেটিস দ্রুত বাড়ছে। এটি ভবিষ্যতে তাদের হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. শারমিন জাহান নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রসঙ্গে বলেন, নারীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), অনিয়মিত মাসিক ও বন্ধ্যত্বের মতো সমস্যাগুলো এখন প্রকট। সামাজিক সংকোচ ভেঙে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এসেডবির সহসভাপতি অধ্যাপক ডা. রুহুল আমীন, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল ইসলাম, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আতিকুর রহমান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এমএ হালিম খান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুরজাহান বানু ও রেনাটা পিএলসির হেড অব মার্কেটিং (ডার্মা পোর্টফোলিও) খায়রুল ইসলাম প্রমুখ।

শেয়ার করুন