নতুন প্রশ্ন নেপালি প্রজন্মের

- আপডেট: ০১:১২:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 68
সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ নেপালের জেন-জির নেতৃত্বাধীন যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তা দেশটির ইতিহাসে এক রূপান্তরের ইতিহাস তৈরি করেছে। তবে শুধু এই অভ্যুত্থানই সেই রূপান্তরের একমাত্র কারণ নয়। অবশ্য অতীতের কিছু উদাহরণ বলছে, অতীতেও এ ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। এবারের জেন-জি আন্দোলন বিশ্লেষণের আগে আমি গত শতাব্দীর একটি উদাহরণ দিতে চাই। ১৯৬৮ সালের ১০ মে ফ্রান্সের প্যারিসে অভ্যুত্থান ঘটে। সেটি এক যুগের সমাপ্তি ও অন্য যুগের সূচনা করে। নেপালের এই আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এটি ঐতিহাসিক প্রতিবাদের নিরিখে বিপ্লব ও পরিবর্তনের চেতনায় পরিচালিত।
ফ্রান্সের অভ্যুত্থানও শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল। সেটি ১৭৮৯ সালের পর ফরাসি বিপ্লবের পথ ধরে হয়েছিল, যেটি ফ্রান্স ও বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিল। আমি মনে করি, নেপালেও তার প্রভাব আছে। আন্দোলনকারীরা ছিল বর্তমান প্রজন্মের তরুণ শিক্ষার্থী। পাশাপাশি বয়স্করাও ছিল। ফ্রান্সের মতো নেপালের প্রজন্মেরও প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল সমাজ পরিবর্তন। জেন-জিরা নেপালজুড়ে বিক্ষোভ করে। ৮ সেপ্টেম্বর তারা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে নেমে আসে। তাদেরও লক্ষ্য ছিল পরিবর্তন।
নেপালের জেন-জি বিক্ষোভকে আমাদের ঐতিহাসিক দিক থেকে দেখা দরকার। কারণ এর উত্তরাধিকার নেপালের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে। বিদ্রোহী ছাত্র ও জনতা প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে দ্রুতই ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন করে দিয়েছে।
১৯৯০ সালে নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তন শাহ রাজবংশকেন্দ্রিক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে রাজা বীরেন্দ্রকে। সেই আন্দোলনের ফলেই দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালে এসে গণআন্দোলন রাজা বীরেন্দ্রর উত্তরসূরি তাঁর ছোট ভাই রাজা জ্ঞানেন্দ্রকেও ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর ২০০৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর নেপাল সাংবিধানিকভাবে ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। লোকরাজ বরাল, কৃষ্ণ হাচেতুসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও পশ্চিমা আধুনিক গবেষকদের মতে, সার্বভৌম ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রের ধারণা শেষ হয়ে গেছে।
নেপালের গুরুত্বপূর্ণ এই রূপান্তরের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও যথাযথ ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ছে। সে জন্য প্রয়োজন ছিল দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের। নতুন এই ব্যবস্থা মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। তাদের নেতারা দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থার মধ্যে থেকে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও নৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে কাজ করার ধারা তৈরি করে।
স্কুল-কলেজের ইউনিফর্মধারী তরুণদের ৮ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভ তারুণ্যের বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ। যখন দুর্নীতিবাজ, উদ্ধত, অদূরদর্শী সরকার সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করেছিল, এর মাধ্যমে তারা নতুন বার্তা পায়। সরকার যখন প্রধান সব সামাজিক মাধ্যম এবং বার্তা আদান-প্রদানের ওয়েবসাইট ও অ্যাপস নিষিদ্ধ করে তখন সবাই জেগে ওঠে। সরকার অন্যায্যভাবে সামাজিক মাধ্যমগুলোকে নতুন আইনে নিবন্ধন করতে সাত দিন সময় দেয়। সরকারের এ সিদ্ধান্ত ছিল অদূরদর্শী এবং স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। সরকার এই ভয় পেয়েছিল, তারা ভুয়া আইডি খুলে সামাজিক মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু এই সন্দেহের কোনো ভিত্তি ছিল না। সামাজিক মাধ্যমের ওপর হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা প্রজন্মকে হতবাক করে দিয়েছিল। ফলে জেন-জি যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং যারা এর লক্ষ্যবস্তু ছিল তাদের প্রজন্ম দুর্নীতিবাজ ও সম্পদের মোহগ্রস্ত হিসেবে আখ্যা দেয়। আন্দোলন সহিংসতায় মোড় নেয় এবং ৮ সেপ্টেম্বর ১৯ জন প্রাণ হারায়। এরপর সরকার সামাজিক মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।
শুধু সামাজিক মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণেই তরুণরা হতাশ ও ক্রোধান্বিত হয়নি। দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব, দায়মুক্তিও এ আন্দোলনকে বেগবান করে। তরুণদের হত্যা করার ফলে বিক্ষোভ আরও ত্বরান্বিত হয়। এ পর্যন্ত পঞ্চাশের অধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিক্ষোভের পর জেন-জি তরুণরা অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, যাতে দেশের শৃঙ্খলা ফিরে আসে। বিক্ষোভকারীদের ১০ জন খ্যাতিমান নেতা যখন তাদের জীবন, রাজনীতি ও প্রজন্মগত প্রশ্নে তাদের মতামত তুলে ধরেন, তা ছিল গভীর ও অর্থবহ। এক নেতা তাঁর সতীর্থের রক্তমাখা শার্ট দেখিয়ে কেঁদেছিলেন। তারা সবাই দেশের ইতিহাসের নতুন সঠিক পথ খুঁজছিলেন।
ইতিহাসের মোড় ঘুরানো বহু ঘটনার সাক্ষী নেপাল। এখন আমরা সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার পেয়েছি। আমরা এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী– এ সরকার দেশকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।










