০৩:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

খুলনার দাকোপে ঘড়বাড়ী বিলীন , আতঙ্কে গ্রামবাসী

ইউএন এ প্রতিনিধি:
  • আপডেট: ০২:০০:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
  • / 68

দুই চালা টিনের বসতঘর ছিল দিনমজুর রবেন বালার (৫৫)। রাতে পরিবার নিয়ে শুয়েও ছিলেন সেই ঘরে। মঙ্গলবার রাতে এক কাপড়ে সেই ঘর ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। চোখের সামনে মুহূর্তেই মাথা গোঁজার ঠাঁইটি খরস্রোতা ঢাকি নদীতে বিলীন হতে দেখেন রবেন বালা। ঘর থেকে বের করতে পারেননি কিছুই।

খুলনার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দিরের কাছেই বাড়ি রবেন বালার। এক রাতে গৃহহীন হয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। এই অবস্থায় কোথায় যাবেন, কী করবেন– কিছুই বুঝতে পারছেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রবেন বালা বলেন, গভীর রাতে চোখের সামনেই তাঁর বসতঘরটি নিয়ে নিল ঢাকি নদী। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীকে নিয়ে এখন কোথায় যাব? আপাতত পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।

ঢাকি নদীতে বসতঘর, বাড়ি, কৃষিজমি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা হারানোর কষ্ট শুধু রবেন বালার একার নয়, বারবার ভাঙনে ওই এলাকার দুই শতাধিক পরিবারের একই দুর্দশা। পরিবারগুলোর অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন তারা।

বুধবার সরেজমিন ঘুরে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাকি নদীর প্রবল স্রোতে উপজেলার পাউবোর ৩১নং পোল্ডারের ৭নং তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরি মন্দিরের সামনে বেড়িবাঁধের প্রায় দুইশ মিটার বাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। এতে বিলীন হয় বাঁধঘেঁষা রবেন বালার ঘর ও জমি। তাঁর প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি পানির তোড়ে বিধ্বস্ত হয়। ভাঙনের আশঙ্কায় গতকাল সকালে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর তারা সরিয়ে নেন।

গতকাল সকালে পানি নেমে যাওয়ার পর স্থানীয় প্রকাশ বালা, সঞ্জিত বালা, তারাপদ বালা, শ্রীকান্ত বালা, প্রদীপ বালা, সুরঞ্জন বালা, সঞ্জয় সরদারসহ অনেককে তাদের বসতঘর ও নানা স্থাপনা ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। বেশ কিছু বসতঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়তে দেখা গেছে। ভেঙে যাওয়া বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় হাজারো হেক্টর আমন ফসলের জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

স্থানীয়রা জানান, দুই বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও শক্তিসহ প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের কারণে ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়ে বটবুনিয়া বাজার এলাকার প্রায় এক হাজার মিটার বেড়িবাঁধ। তখন বটবুনিয়া বাজারের সামনের বাঁধ ভেঙে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো পরিবারের বসতঘর, বাড়ি ও স্থাপনা। ওই সময় বেড়িবাঁধ ও বাঁধের ওপর নির্মিত শতাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ঢাকি নদীতে বিলীন হয়। নদীভাঙনের কারণে পাউবোর বেড়িবাঁধের পাশে গভীরতা বেড়ে যায়। ওই সময় পাউবো কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নদীতে ডাম্পিং ব্যবহারসহ বালুভর্তি টিউবব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করে। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি বাঁধটি রক্ষার্থে বিকল্প বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেন। তখন অনেক জমির মালিক তাদের কৃষিজমি ছাড়তে বা জমি থেকে মাটি দিতে রাজি হননি। তবু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে লোকালয়ে পানি ঢোকা বন্ধ করে।

মঙ্গলবার রাতে ভেঙে যাওয়া বাঁধে কর্মরত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোঃ মতিন রহমান বলেন, বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় মাটি লাগে। কিন্তু সে মাটি নিতে বারবার বাধা পেতে হচ্ছে স্থানীয় জমির মালিকদের কাছ থেকে। বাঁধের ওপর প্রয়োজনীয় মাটি দিতে না পারলে সেটা কখনও টেকসই হতে পারে না। এ ছাড়া এখন কৃষকের জমিতে রয়েছে আমন ফসল, তাই বাঁধে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মাটি পাওয়া যাচ্ছে না। ভেঙে যাওয়া বাঁধের পাশে ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ গভীরতার পাশেই বাঁধ নির্মিত হলে আবারও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
তিলডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী জালাল উদ্দিন বলেন, পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ আটকানোর কাজ শুরু হবে। ভেঙে যাওয়া স্থানে বালুভর্তি জিওব্যাগ এবং টিউবব্যাগ ফেলা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাঁধের ওপর কৃষকের জমি থেকে মাটি নিতে বাধার বিষয়ে তাঁর জানা নেই। জানলে অবশ্যই এমনটি হতো না।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম জানান, ৩১নং পোল্ডারের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারের কাজ চলমান। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বটবুনিয়া বাজার এলাকায় ভেঙে যাওয়া বাঁধটি আটকানোর কাজ শুরু করবে। ইতোমধ্যে সেখানে ডাম্পিং ও বালুভর্তি টিউবব্যাগ ফেলা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় মাটি কাটতে গেলে সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দু-একজন কৃষকের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে বর্তমানে কৃষকের জমিতে রোপা আমন ফসলের আবাদ থাকায় ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠানটি বাঁধের ওপর প্রয়োজনীয় মাটি ফেলতে পারছে না। বাঁধটি আটকানোর জন্য সবার সহযোগিতা দরকার।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

খুলনার দাকোপে ঘড়বাড়ী বিলীন , আতঙ্কে গ্রামবাসী

আপডেট: ০২:০০:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫

দুই চালা টিনের বসতঘর ছিল দিনমজুর রবেন বালার (৫৫)। রাতে পরিবার নিয়ে শুয়েও ছিলেন সেই ঘরে। মঙ্গলবার রাতে এক কাপড়ে সেই ঘর ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। চোখের সামনে মুহূর্তেই মাথা গোঁজার ঠাঁইটি খরস্রোতা ঢাকি নদীতে বিলীন হতে দেখেন রবেন বালা। ঘর থেকে বের করতে পারেননি কিছুই।

খুলনার দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরিসভা মন্দিরের কাছেই বাড়ি রবেন বালার। এক রাতে গৃহহীন হয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। এই অবস্থায় কোথায় যাবেন, কী করবেন– কিছুই বুঝতে পারছেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রবেন বালা বলেন, গভীর রাতে চোখের সামনেই তাঁর বসতঘরটি নিয়ে নিল ঢাকি নদী। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীকে নিয়ে এখন কোথায় যাব? আপাতত পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা।

ঢাকি নদীতে বসতঘর, বাড়ি, কৃষিজমি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা হারানোর কষ্ট শুধু রবেন বালার একার নয়, বারবার ভাঙনে ওই এলাকার দুই শতাধিক পরিবারের একই দুর্দশা। পরিবারগুলোর অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন তারা।

বুধবার সরেজমিন ঘুরে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাকি নদীর প্রবল স্রোতে উপজেলার পাউবোর ৩১নং পোল্ডারের ৭নং তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের বটবুনিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে হরি মন্দিরের সামনে বেড়িবাঁধের প্রায় দুইশ মিটার বাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। এতে বিলীন হয় বাঁধঘেঁষা রবেন বালার ঘর ও জমি। তাঁর প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি পানির তোড়ে বিধ্বস্ত হয়। ভাঙনের আশঙ্কায় গতকাল সকালে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর তারা সরিয়ে নেন।

গতকাল সকালে পানি নেমে যাওয়ার পর স্থানীয় প্রকাশ বালা, সঞ্জিত বালা, তারাপদ বালা, শ্রীকান্ত বালা, প্রদীপ বালা, সুরঞ্জন বালা, সঞ্জয় সরদারসহ অনেককে তাদের বসতঘর ও নানা স্থাপনা ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। বেশ কিছু বসতঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়তে দেখা গেছে। ভেঙে যাওয়া বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় হাজারো হেক্টর আমন ফসলের জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

স্থানীয়রা জানান, দুই বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও শক্তিসহ প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের কারণে ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়ে বটবুনিয়া বাজার এলাকার প্রায় এক হাজার মিটার বেড়িবাঁধ। তখন বটবুনিয়া বাজারের সামনের বাঁধ ভেঙে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজারো পরিবারের বসতঘর, বাড়ি ও স্থাপনা। ওই সময় বেড়িবাঁধ ও বাঁধের ওপর নির্মিত শতাধিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ঢাকি নদীতে বিলীন হয়। নদীভাঙনের কারণে পাউবোর বেড়িবাঁধের পাশে গভীরতা বেড়ে যায়। ওই সময় পাউবো কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নদীতে ডাম্পিং ব্যবহারসহ বালুভর্তি টিউবব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করে। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি বাঁধটি রক্ষার্থে বিকল্প বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেন। তখন অনেক জমির মালিক তাদের কৃষিজমি ছাড়তে বা জমি থেকে মাটি দিতে রাজি হননি। তবু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে লোকালয়ে পানি ঢোকা বন্ধ করে।

মঙ্গলবার রাতে ভেঙে যাওয়া বাঁধে কর্মরত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোঃ মতিন রহমান বলেন, বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় মাটি লাগে। কিন্তু সে মাটি নিতে বারবার বাধা পেতে হচ্ছে স্থানীয় জমির মালিকদের কাছ থেকে। বাঁধের ওপর প্রয়োজনীয় মাটি দিতে না পারলে সেটা কখনও টেকসই হতে পারে না। এ ছাড়া এখন কৃষকের জমিতে রয়েছে আমন ফসল, তাই বাঁধে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মাটি পাওয়া যাচ্ছে না। ভেঙে যাওয়া বাঁধের পাশে ৫০ থেকে ৬০ ফুট গভীরতা সৃষ্টি হয়েছে। এ গভীরতার পাশেই বাঁধ নির্মিত হলে আবারও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
তিলডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী জালাল উদ্দিন বলেন, পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ আটকানোর কাজ শুরু হবে। ভেঙে যাওয়া স্থানে বালুভর্তি জিওব্যাগ এবং টিউবব্যাগ ফেলা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাঁধের ওপর কৃষকের জমি থেকে মাটি নিতে বাধার বিষয়ে তাঁর জানা নেই। জানলে অবশ্যই এমনটি হতো না।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম জানান, ৩১নং পোল্ডারের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারের কাজ চলমান। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বটবুনিয়া বাজার এলাকায় ভেঙে যাওয়া বাঁধটি আটকানোর কাজ শুরু করবে। ইতোমধ্যে সেখানে ডাম্পিং ও বালুভর্তি টিউবব্যাগ ফেলা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় মাটি কাটতে গেলে সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দু-একজন কৃষকের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে বর্তমানে কৃষকের জমিতে রোপা আমন ফসলের আবাদ থাকায় ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠানটি বাঁধের ওপর প্রয়োজনীয় মাটি ফেলতে পারছে না। বাঁধটি আটকানোর জন্য সবার সহযোগিতা দরকার।

শেয়ার করুন