১০:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সরছে ইসরায়েলি সেনা, ফিরছে উদ্বাস্তুরা

ইউএন এ প্রতিনিধি:
  • আপডেট: ০১:৩০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 54

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। উপত্যকার বেশ কিছু এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে ইসরায়েল। এতে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। দুই বছরের ইসরায়েলি আগ্রাসনে তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু নেই। তবু সেই ধ্বংসস্তূপেই তাদের বারবার প্রত্যাবর্তন; এ যেন দুর্ভোগের এক অন্তহীন চক্র।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ফুটেজে গতকাল শুক্রবার ধুলোর পথ মাড়িয়ে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে গাজার উত্তরাঞ্চলের দিকে যেতে দেখা যায়। তবে ইসরায়েলের সেনা সদস্যরা উপত্যকার সব অংশ থেকে সরেনি; অর্ধেকের নিয়ন্ত্রণ এখনও তাদের হাতে। এ অবস্থায় আগামীকাল যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে মিসরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইসরায়েল সফরও করবেন।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টায় এ যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অনুমোদন করে। এতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজা থেকে আংশিকভাবে সেনা প্রত্যাহার ও সম্পূর্ণরূপে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পথ সুগম হয়। বিবিসির পল ব্রাউন জানান, গতকাল ইসরায়েলের সামরিক বুলডোজার ও ট্যাঙ্কগুলোকে গাজা সিটির তেল আল হাওয়া এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।

হামাস আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। অপরদিকে ইসরায়েল তাদের কারাগারে থাকা হাজার হাজার বন্দির মধ্যে ২৫০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি ও যুদ্ধের সময় গাজা থেকে আটক এক হাজার ৭০০ জনকে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ায় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে ট্রাকের বহর গাজার বাস্তুচ্যুতদের কাছে ছুটে যাবে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যে আন্তর্জাতিক সেনা মোতায়েন নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে ব্রিটিশ সেনারা যোগ দেবে না। প্যারিসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, অন্যভাবে যুক্তরাজ্য গাজার শান্তি প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে যাবে।

ত্রাণের সব পথ খুলে দিতে বলল ইউনিসেফ
দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, নির্বিঘ্নে ত্রাণ পৌঁছার জন্য গাজার সব পথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। এটা না করলে শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। সংস্থাটির মুখপাত্র রিকার্ডো পাইরেস বলেন, ‘পরিস্থিতি জটিল। আমরা বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিতে আছি। শুধু কয়েক বছরের শিশু নয়, শঙ্কা আছে নবজাতকদের নিয়েও।’ ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ৫০ হাজারের বেশি শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় মিসরে আলোচনার ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার কিছু প্রধান নগর এলাকা থেকে সরে গেছে। তবে তারা এখনও উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজা ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করতে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় থাকবে। তিনি বলেন, ‘যদি এটা সহজ উপায়ে অর্জন করা হয়, তবে তা ভালো; আর যদি তা না হয়, তবে কঠিন উপায়ে অর্জন করা হবে।’ তাঁর এ বক্তব্যে গাজায় আবারও নৃশংসতা শুরু হওয়ার বার্তা রয়েছে।

যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলের সেনা সরিয়ে নেওয়ার জেরে গাজার উত্তরাঞ্চলের দিকে ছুটছেন লাখো ফিলিস্তিনি। কিন্তু তাদের মনে শঙ্কা– আবার যদি হামলা শুরু হয়। দক্ষিণাঞ্চল থেকে রওনা করা মধ্য গাজার বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত এক নারী যুদ্ধবিরতিতে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া, যদিও এসব স্থান ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা আমাদের ভূমিকে ভালোবাসি।’ তিনি বলেন, গাজার মানুষ সব হারিয়েছে। তাদের জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ প্রয়োজন– তাঁবু, পোশাক, খাবার ও পানি প্রয়োজন।
গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার ৪০ বছর বয়সী ইসমাইল জায়দা রয়টার্সকে বলেন, তাঁর বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে; প্রতিবেশীদেরও বাসস্থান বলে কিছু নেই। পুরো এলাকাই ধ্বংসস্তূপ।

হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে, ইসরায়েলের প্রথম ধাপের সেনা প্রত্যাহার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় সম্পন্ন করে। এতে জিম্মিদের মুক্তির জন্য ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শুরু হয়েছে।

গাজার দক্ষিণাঞ্চালের কেন্দ্রস্থল থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস ও সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা থেকে ইসরায়েলের সেনা পিছু হটেছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, তারা ট্যাঙ্কের গোলার শব্দ শুনেছেন। উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে নুসেইরাত ক্যাম্প। সেখানে অবস্থান করছিল ইসরায়েলের সেনারা। তারা পূর্ব দিকে ইসরায়েলি সীমান্তের দিকে রওনা দেয়। সেই সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের উপকূল বরাবর গাজার যে সড়কটি রয়েছে, সেটি থেকেও সরে গেছে সেনারা।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধ ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর করেছে। সেই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যকে পাল্টে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ইরান, ইয়েমেন ও লেবাননে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককেও বড় পরীক্ষায় ফেলেছে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে চাপ দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। এ চুক্তি হওয়ায় ফিলিস্তিনি বা ইসরায়েলি– উভয়েই আনন্দিত। তবে এরই মধ্যে গাজার ৬৭ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে ৯০ শতাংশের বেশি বাড়িঘর। ইসরায়েলের এ আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গাজার নারী ও শিশুরা। ১৮ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে।
হামাসের নির্বাসিত শীর্ষ নেতা খলিল আল-হাইয়া বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছেন। ২০ ইসরায়েলি জিম্মি এখনও জীবিত বলে মনে করা হচ্ছে; ২৬ জনকে মৃত ও দুজনের ভাগ্য অজানা। হামাস বলেছে, মৃতদের মৃতদেহ উদ্ধারে জীবিতদের মুক্তির চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও অনেক বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। হামাস ইসরায়েলের কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি চেয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার কিছু শর্ত নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। এর মধ্যে আছে– যুদ্ধ শেষ হলে ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা উপত্যকা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, হামাসের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। হামাস এখনও পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আগামীকাল রোববার মিসরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখান থেকে তিনি তেল আবিবে যাবেন এবং ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেবেন। নেসেটের স্পিকার আমির ওহানা তাঁকে ভাষণের এ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় গতকাল শুক্রবার এক দিনে আরও ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭১ জন। এতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬৭ হাজার ২১১ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন এক লাখ ৬৯ হাজার ৯৬১ জন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল শুক্রবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় করতে অন্তত ২০০ মার্কিন সেনা ইসরায়েলে পাঠানো হবে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের নেতৃত্বে এ সেনা সদস্যরা মিসর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনাদের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করবেন।

শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

সরছে ইসরায়েলি সেনা, ফিরছে উদ্বাস্তুরা

আপডেট: ০১:৩০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। উপত্যকার বেশ কিছু এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে ইসরায়েল। এতে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। দুই বছরের ইসরায়েলি আগ্রাসনে তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু নেই। তবু সেই ধ্বংসস্তূপেই তাদের বারবার প্রত্যাবর্তন; এ যেন দুর্ভোগের এক অন্তহীন চক্র।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ফুটেজে গতকাল শুক্রবার ধুলোর পথ মাড়িয়ে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে গাজার উত্তরাঞ্চলের দিকে যেতে দেখা যায়। তবে ইসরায়েলের সেনা সদস্যরা উপত্যকার সব অংশ থেকে সরেনি; অর্ধেকের নিয়ন্ত্রণ এখনও তাদের হাতে। এ অবস্থায় আগামীকাল যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে মিসরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইসরায়েল সফরও করবেন।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ১২টায় এ যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করা হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অনুমোদন করে। এতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজা থেকে আংশিকভাবে সেনা প্রত্যাহার ও সম্পূর্ণরূপে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পথ সুগম হয়। বিবিসির পল ব্রাউন জানান, গতকাল ইসরায়েলের সামরিক বুলডোজার ও ট্যাঙ্কগুলোকে গাজা সিটির তেল আল হাওয়া এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।

হামাস আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। অপরদিকে ইসরায়েল তাদের কারাগারে থাকা হাজার হাজার বন্দির মধ্যে ২৫০ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি ও যুদ্ধের সময় গাজা থেকে আটক এক হাজার ৭০০ জনকে মুক্তি দেওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ায় খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে ট্রাকের বহর গাজার বাস্তুচ্যুতদের কাছে ছুটে যাবে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যে আন্তর্জাতিক সেনা মোতায়েন নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে ব্রিটিশ সেনারা যোগ দেবে না। প্যারিসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, অন্যভাবে যুক্তরাজ্য গাজার শান্তি প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে যাবে।

ত্রাণের সব পথ খুলে দিতে বলল ইউনিসেফ
দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, নির্বিঘ্নে ত্রাণ পৌঁছার জন্য গাজার সব পথ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। এটা না করলে শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। সংস্থাটির মুখপাত্র রিকার্ডো পাইরেস বলেন, ‘পরিস্থিতি জটিল। আমরা বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিতে আছি। শুধু কয়েক বছরের শিশু নয়, শঙ্কা আছে নবজাতকদের নিয়েও।’ ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ৫০ হাজারের বেশি শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় মিসরে আলোচনার ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার কিছু প্রধান নগর এলাকা থেকে সরে গেছে। তবে তারা এখনও উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
এ প্রসঙ্গে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজা ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করতে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় থাকবে। তিনি বলেন, ‘যদি এটা সহজ উপায়ে অর্জন করা হয়, তবে তা ভালো; আর যদি তা না হয়, তবে কঠিন উপায়ে অর্জন করা হবে।’ তাঁর এ বক্তব্যে গাজায় আবারও নৃশংসতা শুরু হওয়ার বার্তা রয়েছে।

যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলের সেনা সরিয়ে নেওয়ার জেরে গাজার উত্তরাঞ্চলের দিকে ছুটছেন লাখো ফিলিস্তিনি। কিন্তু তাদের মনে শঙ্কা– আবার যদি হামলা শুরু হয়। দক্ষিণাঞ্চল থেকে রওনা করা মধ্য গাজার বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত এক নারী যুদ্ধবিরতিতে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া, যদিও এসব স্থান ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা আমাদের ভূমিকে ভালোবাসি।’ তিনি বলেন, গাজার মানুষ সব হারিয়েছে। তাদের জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ প্রয়োজন– তাঁবু, পোশাক, খাবার ও পানি প্রয়োজন।
গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার ৪০ বছর বয়সী ইসমাইল জায়দা রয়টার্সকে বলেন, তাঁর বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে; প্রতিবেশীদেরও বাসস্থান বলে কিছু নেই। পুরো এলাকাই ধ্বংসস্তূপ।

হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে, ইসরায়েলের প্রথম ধাপের সেনা প্রত্যাহার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় সম্পন্ন করে। এতে জিম্মিদের মুক্তির জন্য ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শুরু হয়েছে।

গাজার দক্ষিণাঞ্চালের কেন্দ্রস্থল থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস ও সীমান্তবর্তী কিছু এলাকা থেকে ইসরায়েলের সেনা পিছু হটেছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, তারা ট্যাঙ্কের গোলার শব্দ শুনেছেন। উপত্যকার কেন্দ্রস্থলে নুসেইরাত ক্যাম্প। সেখানে অবস্থান করছিল ইসরায়েলের সেনারা। তারা পূর্ব দিকে ইসরায়েলি সীমান্তের দিকে রওনা দেয়। সেই সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের উপকূল বরাবর গাজার যে সড়কটি রয়েছে, সেটি থেকেও সরে গেছে সেনারা।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধ ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর করেছে। সেই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যকে পাল্টে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ইরান, ইয়েমেন ও লেবাননে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককেও বড় পরীক্ষায় ফেলেছে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর প্রতি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে চাপ দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। এ চুক্তি হওয়ায় ফিলিস্তিনি বা ইসরায়েলি– উভয়েই আনন্দিত। তবে এরই মধ্যে গাজার ৬৭ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে ৯০ শতাংশের বেশি বাড়িঘর। ইসরায়েলের এ আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গাজার নারী ও শিশুরা। ১৮ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে।
হামাসের নির্বাসিত শীর্ষ নেতা খলিল আল-হাইয়া বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছেন। ২০ ইসরায়েলি জিম্মি এখনও জীবিত বলে মনে করা হচ্ছে; ২৬ জনকে মৃত ও দুজনের ভাগ্য অজানা। হামাস বলেছে, মৃতদের মৃতদেহ উদ্ধারে জীবিতদের মুক্তির চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও অনেক বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে। ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। হামাস ইসরায়েলের কারাগারে থাকা বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি চেয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার কিছু শর্ত নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। এর মধ্যে আছে– যুদ্ধ শেষ হলে ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা উপত্যকা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, হামাসের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। হামাস এখনও পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আগামীকাল রোববার মিসরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখান থেকে তিনি তেল আবিবে যাবেন এবং ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেবেন। নেসেটের স্পিকার আমির ওহানা তাঁকে ভাষণের এ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় গতকাল শুক্রবার এক দিনে আরও ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭১ জন। এতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬৭ হাজার ২১১ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন এক লাখ ৬৯ হাজার ৯৬১ জন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল শুক্রবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় করতে অন্তত ২০০ মার্কিন সেনা ইসরায়েলে পাঠানো হবে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের নেতৃত্বে এ সেনা সদস্যরা মিসর, কাতার, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেনাদের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করবেন।

শেয়ার করুন