সৌদি, তুরস্ক, পাকিস্তান জোটে বাংলাদেশ?

- আপডেট: ১১:৩৩:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
- / 13
বিশ্বায়নের ঝড়ে ছোট-বড় ভেদাভেদের অবস্থা বর্তমান দুনিয়ায় অচল। প্রতিবেশী বিষয় নয়। ভৌগোলিক দূরত্ব দিয়ে আর নৈকট্য নির্ণয় করা যাচ্ছে না। বিশ্ববাস্তবতায় সুদূরের দেশও নানান সমীকরণে হয়ে যাচ্ছে নিকট দেশ। মোটকথা ছোটকে ছোট ভেবে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। বড়কেও একতরফা বড় ভাবার অবকাশ নেই। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের ছাতায় গোলার্ধ মুখ্য নয়। বিশাল এবং সুপার পাওয়ার হওয়ার দৌড়ে আগুয়ান ভারতের মতো দেশকে নানামুখী ভাবনায় থাকতে হচ্ছে ভৌগোলিকভাবে ছোট বাংলাদেশকে নিয়ে। দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির ওপর নয়াদিল্লি নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। কোনো ধরনের ভুল-বোঝাবুঝি বা ভুল ব্যাখ্যা এড়াতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগের সব চ্যানেল খোলা রাখা হয়েছে। কথাটি কোনো ক্লোজডোরে নয়, বলেছেন ১৩ জানুয়ারি নয়া দিল্লিতে সেনাবাহিনীর বার্ষিক সংবাদসম্মেলনে। অবস্থা কোথায় গেলে এমন ভাবনায় আসতে হয়! তা আবার প্রেস কনফারেন্সেও জানাতে হয়! ভ‚রাজনীতি, সার্বভৌমত্ব, সমরবিদ, কূটনীতিকদের পাঠপঠন দ্রুত বাঁক বদলের এ সন্ধিক্ষণই এ বাস্তবতাকে অনিবার্য করে তুলেছে।
বিশ্বরাজনীতি-ক‚টনীতিতে কোল্ড ওয়ার শব্দটি ১৯৪৫ সালে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েল তার ’ইউ অ্যান্ড দ্য এটোমিক বম্ব’ প্রবন্ধে। শব্দটি অধিকতর পরিচিতি পায় ১৯৪৭ সালে মার্কিন উপদেষ্টা বার্নার্ড বারুচের একটি বক্তৃতা এবং সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যানের বইয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন-সোভিয়েত দ্ব›দ্বকে বোঝাতে এই শব্দটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে কোল্ড ওয়ার এবং বিশ্বের ভারসাম্য দুটোই ভ‚পতিত হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সামনে কী অপেক্ষা করছে কাঙ্খিত শান্তির বিশ্ব না আরেকটি নিউক্লিয়ার ওয়ার? তুরস্কের সৌদি ও পাকিস্তান সামরিক জোটে যোগ দিতে আগ্রহের মধ্য দিয়ে প্রশ্নটি আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। এ যোগদান বা সম্মিলন ঘটলে এক দেশের ওপর হামলা অন্য দেশ বা দেশগুলোর ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে। ত্রিদেশীয় এই সামরিক জোট প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময় ও উন্নয়নে একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। প্রভাব ফেলবে সিকিউরিটি ডাইনামিক্সে। তা হয়ে গেলে ভবিষ্যতে মুসলিম বিশ্বের নেটো হয়ে উঠতে পারে এ জোট। সামরিক জোট নিয়ে এ ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে নীতি, আদর্শ, চেতনা জোট ফেরি করার অবসান ঘটবে।
এ জোটে বাংলাদেশেরও যাওয়ার তাগিদ ঘুরছে। বাড়তি হিসেবে চীনকেও সঙ্গে রাখা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমমবার্গ দ্রুত এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছে। তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তির সম্ভাব্যতা সম্পর্কে অবগত কয়েক জন ব্যক্তির বরাতে খবরটি ছেড়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি। এতে আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইসলামাবাদ সুদানের দিকে ঝুঁকছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করতে চলেছে। অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি এয়ার মার্শাল আমির মাসুদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, বিক্রি সংক্রান্ত চুক্তিটি চ‚ড়ান্ত হয়েছে। জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানও বিক্রির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব হলো আরব বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা জি-২০ জোটে প্রতিনিধিত্ব করছে। ইসলাম ধর্মের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার অবস্থান এখানে। পাকিস্তান হলো মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আর তুরস্ক হলো সামরিক জোট ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাসমৃদ্ধ দেশ। পাকিস্তান ও তুরস্ক দুই দেশই ক্রমাগত অস্ত্রের বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহ করেছে তুরস্ক। একই সঙ্গে দেশটি সিরিয়ার সামরিক খাতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছে। লিবিয়ায়ও তাদের সেনা মোতায়েন রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান তাদের অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টায় নিজেদের সামরিক দক্ষতাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। গত ডিসেম্বর দেশটি লিবিয়ার জেনারেল খলিফা হাফতারের লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির কাছে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানসহ সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির জন্য ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা চলছে। যৌথভাবে এই যুদ্ধবিমানগুলো তৈরি করে চীন ও পাকিস্তান। আলাদা করে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও সৌদি ও তুরস্কের মধ্যে সব সময় মতৈক্য হতে দেখা যায় না। এবার বাস্তবতার অনিবার্যতায় প্রেক্ষাপট বদল। এর আগে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আরব বসন্তের পরে হওয়া গণবিক্ষোভগুলোকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আর ঐসব বিক্ষোভকে সৌদি আরব তাদের রাজতান্ত্রিক শাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল। এক দশক আগে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাহিনী মিলে লিবিয়ায় তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। তারা মিশরের প্রেসিডেন্ট ও সাবেক জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকেও সমর্থন জানিয়েছিল। অথচ এরদোয়ান একসময় সিসির সমালোচনা করেছিলেন। এখন এরদোয়ান ও সিসির মধ্যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের ওপর বড় আকারে হামলাজনিত উদ্বেগকে কেন্দ্র করে তারা একমুখী। সৌদি আরব এবং তুরস্কের সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা ২০২১ সাল থেকে। সম্প্রতি তারা সিরিয়ার মতো উত্তেজনাপূর্ণ এলাকায় কৌশলগতভাবে একাত্ম হচ্ছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এরদোয়ান এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর যেসব দেশ তাদের প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছিল, সৌদি আরব তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৫১ সালে দুই দেশ একটি ‘বন্ধুত্ব চুক্তি’ (ট্রিটি অব ফ্রেন্ডশিপ) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি দশকের পর দশক দুই দেশের কৌশলগত, রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। বিগত বছরগুলোতে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বেশ কয়েক বার সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা উপসাগরীয় অঞ্চল ও পাকিস্তানে সৌদি সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এই গোলার্ধের বাংলাদেশ কী করবে? সামনের নির্বাচনের পর পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত উদীয়মান শক্তিশালী সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছে। গত মাস কয়েকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠক এবং পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এই আলোচনার পালে নতুন টোকা দিয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আঞ্চলিক ভ‚রাজনীতির নতুন মেরুকরণের অংশ হিসেবেই আলোচনার এমন বাতাস। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিলে তা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোতে দেখা যেতে পারে নতুন চেহারা। চব্বিশের সেপ্টেম্বরই রিয়াদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়েছে, দুই দেশের যে কোনো একটির ওপর হামলাকে উভয়ের বিরুদ্ধেই আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হবে। এর ভিত্তি জোরালো হলো ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটির মাধ্যমেই। ঐ চুক্তির মূল ধারা অনুযায়ী, যে কোনো এক দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে যা অনেকটা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি। বাংলাদেশ এই জোটের শরিক হলে প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং সামরিক সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এ মাসেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের পাকিস্তান সফরকালে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভ‚মিকা রাখবে বলে বিদেশি গণমাধ্যমেও প্রচার পাচ্ছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জন্য সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ সামরিক মহড়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে এই জোটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের অধীনে খসড়া চুক্তির কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার সময়-সুযোগ এ সরকারের হচ্ছে না। তা করতে হবে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ ও সরকারকে। পাকিস্তানের টাইমস অব ইসলামাবাদ এ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন করেছে। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমও পিছিয়ে নেই। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত শুল্ক সংঘাত বাস্তবে রূপ নিলে সেটি বাংলাদেশের জন্য হবে পরীক্ষার মুহূর্ত। একই সঙ্গে সুবর্ণ সুযোগও তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারত যদি শুল্কের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যাল, চামড়া ও আইটি সেবায় বাংলাদেশ একটি বাস্তব বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী নেতৃত্ব। নতুন কোল্ড ওয়ারের এই কঠিন সময়ে কোন নেতৃত্ব কীভাবে পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।









