জামায়াতের প্রার্থী বাছাই শেষ, ভোটের প্রস্তুতি জোরেশোরে

- আপডেট: ১২:৫২:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 46
জামায়াতে ইসলামী ২৯৮টি আসনে প্রার্থী ঠিক করেছে। দলের তৃণমূলের ভোটে এসব প্রার্থী ঠিক করা হয়েছে বলে জামায়াত জানিয়েছে। এর মধ্যে দুটি আসনে দলটির ঐতিহ্য ভেঙে প্রার্থী নিয়ে প্রকাশ্য অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে।
জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, জোট গঠন হলে বা কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে শরিক দলের সমর্থনে প্রার্থী সরিয়ে নেওয়া হবে। তাই কিছু আসনে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে।
আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির মিত্র এ দলটি এখন তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। সংস্কারের বেলায়ও তারা কয়েকটি বিষয়ে বিএনপির বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। সর্বশেষ সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে ছয়টি দলকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনও করছে জামায়াত। পিআর দাবি আদায় না হলে নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা– ভেবে দেখার হুঁশিয়ারি দিলেও দলটি সব আসনেই প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই করে গত জানুয়ারি থেকে ভোটের প্রচার শুরু করেছে। সারাদেশে তাদের নেতাকর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন।
জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, পিআরের দাবিতে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় করা না গেলে বিদ্যমান পদ্ধতিতে নির্বাচনে কীভাবে ভালো ফল করা যাবে, সে প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। যদিও তাদের প্রার্থীরা পিআরের পক্ষে বলছেন এবং ভোট চাইছেন।
জামায়াত গত বছরের নভেম্বর, ডিসেম্বরে প্রথম এবং গত জুলাইয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করেছে বলে জানিয়েছেন এ জ্যেষ্ঠ নেতা। তাঁর দাবি অনুযায়ী, জামায়াত রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের সব, খুলনার ৩৫ আসনের সব, রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের ১০-১২টি, বরিশালের ২১ আসনের তিনটি, চট্টগ্রামের ৫৮ আসনের ১২টি, সিলেটের ১৯ আসনের তিনটি, ময়মনসিংহের ২৪টি আসনের দুটি এবং ঢাকার ৭১ আসনের কয়েকটিসহ শতাধিক আসনে বিএনপির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবে। তবে জোট বা সমঝোতা হলে এসব আসনের কয়েকটি ছেড়ে দেওয়া হবে নির্বাচনী মিত্রদের।
জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা
দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ১৪ বছর কারাভোগের পর মুক্ত এটিএম আজহারুল ইসলাম রংপুর-২, দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫, নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান রাজশাহী-১, ডা. তাহের কুমিল্লা-১১, সহকারী সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান সিরাজগঞ্জ-৪, হামিদুর রহমান আযাদ কক্সবাজার-২ আসনে প্রার্থী হবেন।
যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমিন পাবনা-১, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী পিরোজপুর-১, আরেক ছেলে শামীম সাঈদী পিরোজপুর-২, মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন আরমান ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচন করবেন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি দেলওয়ার হোসেন সাঈদী। কক্সবাজার-১ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে লড়বেন স্থানীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল ফারুক। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, এই আসনে জামায়াত আগে জয়ী হলেও সালাহউদ্দিনের মতো ‘হেভিওয়েট’ নেতাকে আটকানো কঠিন।
বিতর্কিতরা বাদ পড়তে পারেন
জামায়াত সূত্র জানিয়েছ, স্থানীয় পর্যায় থেকে আপত্তি আসায় নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের প্রার্থী বদল হতে পারে। সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের পর জেলায় একটি আসন বৃদ্ধি পাওয়ায় নবগঠিত গাজীপুর-৬ আসনে প্রার্থী এখনও ঠিক করেনি জামায়াত। আগের সীমানা ধরে বাগেরহাট জেলায় চারটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। সীমানা পুননির্ধারণে জেলায় একটি আসন কমে যাওয়ায় সেখানে প্রার্থী পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
গত জানুয়ারিতে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই শুরু করে জামায়াত। পরের মাসে জেলার নেতাদের ভোটে কুষ্টিয়া জেলার চারটি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে দলের মজলিসে শূরার সদস্য ফরহাদ হুসাইনের নাম আসে। কিন্তু মে মাসে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ওয়াজের বক্তা আমির হামজার নাম ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে আজান দেওয়া নিয়ে অসত্য বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হন তিনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া তাঁর বক্তব্যকেও ভিত্তিহীন বলেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এর আগে আমির হামজা ভারতের চিত্রনায়িকা রাশমিকা মান্দানার রূপ-লাবণ্য নিয়ে ওয়াজে বক্তব্য দিয়ে বিতর্কিত হন। তাঁর ওয়াজের পুরোনো ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আমির হামজা ৫ আগস্টের আগে নিজেকে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য দাবি করছেন। শেখ হাসিনাকে ১৬ কোটি জনগণের জননী আখ্যা দিয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণের আহ্বান জানাচ্ছেন।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে জানিয়েছেন, আমির হামজাকে সতর্ক করা হয়েছে।
বক্তব্যের জন্য আমির হামজা ইতোমধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, আমির হামজাকে প্রার্থী করা হবে কিনা, তা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এবার ভিন্ন চিন্তা
জামায়াতের প্রার্থী হন দলটির রুকনরা (সদস্য)। দলীয় পদ কিংবা মনোনয়ন চাওয়ার সুযোগ নেই। জেলা এবং উপজেলা নেতারা গোপন ভোটে আসনওয়ারি প্রার্থী ঠিক করেন। তারপর তা কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কেন্দ্র তা অনুমোদন করলে প্রার্থী ঠিক হয়। তবে দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড তৃণমূলের বাছাই প্রার্থী করা পরিবর্তন করতে পারে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম সমকালকে বলেন, অন্য দল থেকে এসে বা জামায়াতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ নেই। মনোনয়ন চাওয়ারও সুযোগ নেই। যোগ্য হলে দলের নেতাকর্মীরাই বেছে নেবে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় বহু দশক ধরে অনুসরণ করা জামায়াতের এ নিয়ম পরিবর্তন হতে পারে। ভোটে বিএনপিকে টক্কর দিতে দলের বাইরে থেকেও প্রার্থী আনার চিন্তা রয়েছে তাদের। একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, এলাকায় গ্রহণযোগ্য, জাতীয়ভাবে পরিচিত কোনো মুখ প্রার্থী হতে চাইলে বিবেচনা করা হবে। আগ্রহ ও যোগ্যতা থাকলে অমুসলিম ব্যক্তিদেরও বিবেচনা করা হবে।
সমঝোতা হলে মিত্রদের ছাড়
১৯৯৬ সালের পর এককভাবে নির্বাচন করেনি জামায়াত। ২০০১ সালে ৩১, ২০০৮ সালে ৩৮ এবং ২০১৮ সালে ২২ আসনে বিএনপির সঙ্গে জোট করে প্রার্থী দেয় তারা। দলের নিবন্ধন ফিরে পাওয়া জামায়াত এবার চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনহ কয়েকটি দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার আলাপ চালাচ্ছে।
ডা. আবদুল্লাহ তাহের সমকালকে বলেন, সমঝোতা হলে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে যাবেন, এ নিয়ে অনিশ্চয়তার কিছু নেই। দলের স্বার্থে যে কাউকে আসন ছাড়তে হতে পারে, তা প্রার্থীরা জানেন। মেনেও নেবেন। নির্বাচনী সমঝোতা হলে জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনা বেশি– এমন আসন ছাড়তেও কার্পণ্য করা হবে না।
জামায়াত সূত্র উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছে, রংপুর-৪ আসনে তাদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সমঝোতা হলে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে এ আসন ছেড়ে দেওয়া হবে। এনসিপির আরেক নেতা হাসনাত আবদুল্লাহসহ আরও কয়েকজনকে একই রকম ছাড় দিতে রাজি জামায়াত। বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ আসন চরমোনাই পীরের দলকে ছেড়ে দেওয়া হবে। উত্তরবঙ্গে যেসব আসনে জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানেও ছাড় দেবে তারা।
কয়েক এলাকায় নজিরবিহীন অসন্তোষ
প্রার্থিতা নিয়ে অতীতে জামায়াতের কোন্দলের নজির না থাকলেও এবার অন্তত দুটি আসনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। পাবনা-৫ (সদর) আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী মাওলানা ইকবাল হোসেনকে বাদ দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করে স্থানীয় জামায়াতের একাংশ। তারা জামায়াতের তিনবারের এমপি আবদুস সোবহানের ঘনিষ্ঠ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আব্দুর রহিমকে প্রার্থী করার দাবি জানান।
স্থানীয় নেতাদের একাংশের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন ইকবাল হোসেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে ছাত্রশিবিরের নেতাদের একাংশ বিক্ষোভ করেছে জেলার সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিনকে প্রার্থী করার দাবিতে। এর পর জসিম উদ্দিনের সাংগঠনিক সব পদ স্থগিত করে জামায়াত।
কেন্দ্রীয় দায়িত্বে থাকা ময়মনসিংহ অঞ্চলের এক নেতা সমকালকে বলেন, জসিমউদ্দিন তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু মামলা, বারবার কারাগারে যাওয়ায় ২০১৮ সালের পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এসব বিবেচনায় তৃণমূল তাঁকে প্রার্থী করেনি। হয়তো জসিম উদ্দিনকে প্রার্থী করলে জয় আসত। কিন্তু আসনের জন্য দলীয় শৃঙ্খলা জরুরি। তাই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৫ আসন নিয়েও অসন্তোষ ছিল। এই আসনের দুইবারের সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরীকে চট্টগ্রাম মহানগরের আমির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে; তবে দলের প্রার্থী করা হয়েছে। ওই আসনের আরেক সাবেক এমপি এবং জামায়াতের নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলামকেও প্রার্থী করা হয়নি। জামায়াত নেতারা তখন বলেছিলেন, তাঁকে অন্য এলাকায় প্রার্থীর করা হবে। যদিও তা হয়নি। জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে তিনি এবং আবদুল হালিম দলের প্রার্থী তালিকায় নেই।




















