০৪:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬

মাদুরোকে আটকের পর ইরান ঘিরে যুদ্ধের শঙ্কা

ইউএনএ নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:৫৮:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 14

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী কর্তৃক আটকের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের শঙ্কাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পরপরই ইসরায়েলি নেতা ইয়ার লাপিদ তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে তা থেকে ইরানের শাসকদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বৈঠকের পর মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এই ঘটনা ইরানের জন্য একটি পরোক্ষ বার্তা। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এমন ‘আইনহীন আচরণ’ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি ইরানকে নিজেদের সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে আগ বাড়িয়ে আঘাত হানতে প্ররোচিত করতে পারে।

মাদুরো ছিলেন ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দুই দেশের মধ্যে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বল অবস্থার পর মাদুরোর বিদায়ে ইরানের মিত্রের বলয় আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মার্কিন অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অবশ্য নতি স্বীকার না করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন যে, তারা শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করবেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই অভিযানের মাধ্যমে তেহরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প যা বলেন তা শেষ পর্যন্ত করে দেখান।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চবাদী’ লক্ষ্য ও কূটনীতির পথ রুদ্ধ করার প্রবণতা সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলছে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, তেহরান এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ হারিয়েছে কারণ ট্রাম্প ইরানকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করাতে চান।

এর আগে গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করলেও বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। তবে ট্রাম্প পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হলে কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করলে ইরানকে কঠোর আঘাত সহ্য করতে হবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও শীর্ষ নেতৃত্ব অপসারণের চেষ্টা চালানো হতে পারে, যা পুরো বিশ্বকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য। তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ হাতে থাকলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলেও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ট্রাম্প তাকে ইতিমধ্যে হুমকি দিয়ে রেখেছেন।

যদিও ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক, তবুও ভেনেজুয়েলায় স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়ে তিনি তার অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার এই সংকট ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াবে নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো যুদ্ধে ব্যস্ত রাখবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

শেয়ার করুন
ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

মাদুরোকে আটকের পর ইরান ঘিরে যুদ্ধের শঙ্কা

আপডেট: ১১:৫৮:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী কর্তৃক আটকের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের শঙ্কাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পরপরই ইসরায়েলি নেতা ইয়ার লাপিদ তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে তা থেকে ইরানের শাসকদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বৈঠকের পর মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এই ঘটনা ইরানের জন্য একটি পরোক্ষ বার্তা। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের এমন ‘আইনহীন আচরণ’ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি ইরানকে নিজেদের সামরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে আগ বাড়িয়ে আঘাত হানতে প্ররোচিত করতে পারে।

মাদুরো ছিলেন ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দুই দেশের মধ্যে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বল অবস্থার পর মাদুরোর বিদায়ে ইরানের মিত্রের বলয় আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই মার্কিন অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি অবশ্য নতি স্বীকার না করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন যে, তারা শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করবেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই অভিযানের মাধ্যমে তেহরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, ট্রাম্প যা বলেন তা শেষ পর্যন্ত করে দেখান।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চবাদী’ লক্ষ্য ও কূটনীতির পথ রুদ্ধ করার প্রবণতা সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলছে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, তেহরান এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ হারিয়েছে কারণ ট্রাম্প ইরানকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করাতে চান।

এর আগে গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করলেও বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। তবে ট্রাম্প পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হলে কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করলে ইরানকে কঠোর আঘাত সহ্য করতে হবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও শীর্ষ নেতৃত্ব অপসারণের চেষ্টা চালানো হতে পারে, যা পুরো বিশ্বকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাও এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য। তাদের মতে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ হাতে থাকলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলেও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ট্রাম্প তাকে ইতিমধ্যে হুমকি দিয়ে রেখেছেন।

যদিও ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক, তবুও ভেনেজুয়েলায় স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়ে তিনি তার অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার এই সংকট ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াবে নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো যুদ্ধে ব্যস্ত রাখবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

শেয়ার করুন