স্বীকৃতির অপেক্ষায় পায়রার নারী জেলে মীমের লড়াই

- আপডেট: ০৩:৩২:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
- / 27
পায়রা নদীর উত্তাল বুকে ভোরের কুয়াশা ভেদ করে যখন একটি ছোট্ট নৌকা এগিয়ে যায়, নৌকার মাঝখানে বসে থাকে পাঁচ বছরের একটি শিশু। আর দাঁড় টেনে নৌকা চালান ২৬ বছর বয়সী মীম আক্তার। জীবন তার কাছে কোনো গল্প নয় বরং প্রতিদিনের কঠিন সংগ্রাম।
বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের জেলেপল্লীর বাসিন্দা মীম আক্তার জন্মেছেন জেলে পরিবারে। বাবা জলিল মোল্লা ছিলেন পেশায় জেলে। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত তার বাবাকে হারান মাত্র তিন মাস বয়সে। বাবার মৃত্যুর পর মা নাজমা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে সংসার গড়েন। তিন ভাইবোনের মধ্যে মীম মেজ। বড় ভাই জাকির হোসেন কোনোভাবে সংসারের হাল ধরলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বর্তমানে তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।
২০১৮ সালে মীমের বিয়ে হয় একই উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের আমড়াগাছিয়া গ্রামের রুবেল হাওলাদারের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মাথায় জন্ম নেওয়া কন্যা ইয়ানুরের বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখনই স্বামী নিখোঁজ হয়ে যান। এমতাবস্থায় কোলে শিশুসন্তান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন মীম। সামনে তখন শুধুই অন্ধকার।
সন্তানের জীবন ও জীবিকার তাগিদে মীম ফিরে যান বাবার পেশায়। ধার-দেনা করে পাঁচ হাজার টাকায় একটি ছোট নৌকা ও সামান্য জাল কিনে নামেন পায়রা নদীতে। উত্তাল ঢেউ, ঝড়-বৃষ্টি, নদীর রাক্ষুসে রূপ সবকিছুকে উপেক্ষা করেই শুরু হয় তার জেলে জীবন। নারী হয়ে নদীতে মাছ ধরা ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাঁচতে হলে লড়াই ছাড়া যে উপায় নেই।
পাঁচ বছর ধরে এই পেশায় টিকে আছেন মীম। বহুবার নৌকা ডুবেছে, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তবুও হাল ছাড়েননি। পায়রা নদীতে তিনি পোয়া, পাঙ্গাস, তপসীসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরেন। নদীতে মাছ না থাকলে বালুর চরে চেউয়া মাছ ধরে সংসার চালান। কখনো নদী, কখনো চর জীবনের প্রতিটি দিনই অনিশ্চয়তায় ভরা। আর যখন মাছের দেখা মেলে না, তখন পাঁচ বছরের শিশুকে নিয়ে উপোষ কাটে তাদের দিন।
সংগ্রামী এই নারী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘মোর জীবন বড়ই কষ্টের। দু’মুঠো ভাতের আশায় ঝড়-ঝঞ্ঝা, উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা কইরা নদীতে নামি। মাছ না পাইলে মাইয়াডা লইয়া উপোষ থাকি।’
পেশায় জেলে হলেও আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি তার। নেই কোনো জেলে কার্ড। ফলে সরকারি কোনো সহায়তা বা সুযোগ-সুবিধার আওতায়ও পড়েন না তিনি।
স্থানীয় জেলেরা জানান, ‘আমতলী উপজেলায় মীমই একমাত্র নারী জেলে হলেও এখনো তার নাম জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে যতটুকু জানতে পেরেছি খুব শিগগিরই তার নামে কার্ড ইস্যু করা হবে।’
সরেজমিনে জেলেপল্লী ঘুরে দেখা যায়-নদীর তীরে বাঁধা একটি ছোট নৌকা, তাতে অল্প কিছু জাল, জাল ধরার লাঠি আর ভাসানোর শোলা। সেই নৌকাতেই মেয়েকে বসিয়ে গান গুনগুন করতে করতে মাঝনদীতে জাল ফেলতে যান মীম। সন্ধ্যার আগেই মাছ নিয়ে ফেরেন। ছায়াহীন খোলা আকাশ, প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি সবই যেন মীম আর ইয়ানুরের নিত্যসঙ্গী।
এ বিষয়ে গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. ফারুক আকন বলেন, ‘মীম আক্তারের নাম জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
আমতলী উপজেলা মেরিন ফিশারিজ অফিসার মো. অলিউর রহমান জানান, ‘কী কারণে তার নাম তালিকায় নেই তা খতিয়ে দেখা হবে এবং নতুন করে জেলে নিবন্ধন শুরু হলে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। জেলে নিবন্ধনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
উত্তাল পায়রার বুকে দাঁড় টেনে যাওয়া এই নারী শুধু নিজের নয়, তার শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ বাঁচাতে লড়ছেন। রাষ্ট্রের কাছে তার একটাই দাবি, নিজের পেশার স্বীকৃতি।




















